রচয়িতা

May 25th, 2020 by Jashodhara Purkayastha

একি ! একি! সুচরিতা না ! মহিলা আমার দিকে তাকাতেই আমি একেবারে মর্মাহত ! বড় বড় চাউনিতে ভাবলাম; সেই সুচরিতা! সারা মাথা পাকা চুলে ভরা। মুখের জৌলুস শেষ হয়ে গেছে । চামড়া কুঁচকে গেছে। মনে হচ্ছে সত্তর বছরের কোনো মহিলা।ওর আসল নাম সুচরিতা সেন। মিষ্টির দোকানে সামনাসামনি দেখতে পেয়েছি বলে চিনে নিলাম।

আমার ডাক শুনে মহিলা তাড়াতাড়ি করে সাথের এক সতের/ আঠারো মেয়েকে বললো,”আমাকে এখান থেকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চল ! আমি এক মুহূর্ত ও এখানে দাঁড়াতে চাই না।”

মেয়েটি wheel চেয়ারটি ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেখে জোরে জোরে বলতে লাগলাম ,”সূচি, please একটু দাঁড়া, আমি কল্পনা নন্দী।
আমি কতদিন থেকে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি মনে মনে ,তুই জানিস না। কত জনকে জিজ্ঞেস করেছি তোর ঠিকানা। কিন্তু কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।” আমি পেছন পেছন বলে যাচ্ছিলাম।

দৌঁড়ে গিয়ে wheel চেয়ারটা ধরে মেয়েটিকে বললাম, “ছেড়ে দে; আমি ধাক্কা দিচ্ছি। এই বলে চেয়ারে হাত লাগতেই সূচি,পেছনে তাকিয়ে বললো,” কল্পনা” তুই! বলে ঝর ঝর করে আবেগময় হয়ে গেল।
সামনে একটা পার্কে নিয়ে যাই। চেয়ারটা লক করি। একটি বেঞ্চে বসতেই ওই মেয়েটিকে ডেকে সূচি বললো, “মিনু তুই একটু ঘুরে আয়, আমি আমার বান্ধবীর সাথে একটু কথা বলি। এই বলে 50 টাকার একটি নোট বের করে মিনুর হাতে দিলো।

আমি বেঞ্চে বসে সুচিকে wheel চেয়ার থেকে বেঞ্চে বসলাম।
জিজ্ঞেস করলাম,”সূচি তোর কেন এই অবস্থা। আজ ভাগ্যিস মিষ্টি কিনতে গেছিলাম। তাই তোর সঙ্গে দেখা হলো ।”

সুচরিতা বললো,”সে অনেক ঘটনা কলপু।তোর বিয়ের পর তো তুই আমেরিকা চলে যাস। তার ঠিক দুবছর পর আমার বিয়ে অরুণ দত্ত বলে একজনের সাথে ঠিক হয়। লোকটি আমাকে পছন্দ করেছিল আমার গান শুনে। আমার বিয়ের কার্ডও তোকে পাঠাতে পারলাম না।”

আমি বললাম,”তোর গান পছন্দ করবে না এমন লোক হয়তো এ দুনিয়ায় নেই সূচি; আজও আমার কানে বাজে — অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে । আরো কত গান।”

তারপর সূচি বলতে লাগলো, “অরুণ দত্তও ভালো গান গাইতো। প্রফেশনাল গায়ক না হলেও বেশ নাম ডাক ছিল। কোনো উৎসবানষ্ঠান হলে ওকে অনেক জায়গায় গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতো। আমার সাথে বিয়ের পর বৌভাতের দিন অরুণ নিজেই একটা জলসার আয়োজন করেছিল। সেখানে গান গাওয়ার পর সকলে এত মুগ্ধ হলো যে বার বারই সকলেই বলতে লাগলো ,তুমি তো অরুণ কে হার মানলে!👍 আমি লজ্জায় ‘না !না’ বললাম।”

আমি উৎসুকতার সহিত জিজ্ঞেস করলাম,”সূচি, অরুণ বাবু কি তখন কোনো উত্তর দিয়েছিলেন ?
আমাদের অনেক অবগুন থাকে —- কাম, ক্রোধ, মদ,লোভ, মোহ আর মৎসর। এই অবগুন যখন আমাদের ওপর আধিপত্য শুরু করে, তখন মনের ভেতর এরা বাসা বেঁধে নেয়। তারপর মনকে কুরিয়ে কুরিয়ে খেতে থাকে। মন নিজের বশে আর থাকে না।”

সূচি বলতে লাগলো,”এসব তো তোর মতো এত বুঝি না! রে ; কল্পনা ! দুবছর এভাবে সংসার মোটামুটি ভালোভাবেই চলছিলো।

আমি অনেক জায়গায় প্রোগ্রাম করতে শুরু করলাম। এদিকে অরুণের গানের কদর কমতে আরম্ভ হলো। আমি অনেকবার প্রোগ্রাম বাতিলও করেছি। অরুণ আমাকে বেশ এড়িয়ে যেতে শুরু করে । প্রায়ই অফিস থেকে দেরিতে আসা শুরু করে।”
আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,”তারপর?”
কাঁপা গলায় সূচি বললো, “একদিন শাশুড়ি বললেন, তুমি আমার ছেলেকে একেবারে ধ্বংস করে দিলে”?
আমি আপনার ছেলের কোনো ক্ষতি করিনি মা ।” কান্নায় আকুল হয়ে উত্তর দিলাম।
“আমাকে মা বলতে এস না। নিজের স্বামীর দুঃখ যে মেয়েমানুষ বোঝে না সে আবার স্ত্রী ?? তাই তুমি একটা কুলটা। তুমি এক বন্ধ্যা।’
বন্ধ্যা শুনে কানে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে বললাম,”মা আর কিন্তু একটি শব্দও শুনতে চাই না । আজ আপনি আমাকে এ কথা বলতে পারলেন?”
শাশুড়ী মুখ ঝামটে চলে গেলেন।
অরুণ বাড়ি আসতেই কান্নাকাটি করতে করতে বললেন,”আমি এক মুহূর্তও এই বাড়িতে থাকবো না। তোর বউ এর যা মুখ।”

অরুণ রুমে ঢুকেই বললো, ” অনেকদিন থেকেই বললো ভাবছিলাম,কথাটা । কিন্তু নানা বাঁধায় কথাটা বলা হয়ে উঠছিল না। আমি তোমার সাথে থাকতে পারবো না। এক সপ্তাহের মধ্যে ডিভোর্স পেপার পেয়ে যাবে।”

“কারণ টা কি জানতে পারি ,জিজ্ঞেস করলাম। একটু তর্কাতর্কিতে আমার দিকে হাত উঠানোর চেষ্টা করলো।
থাক ! থাক ! চলে যাবো। কিন্তু যাওযার আগে একটি কথা বলতে চাই অরুণ; এত হিংসা ভালো নয়! আজ গানের জন্য আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ, এই গানই একদিন তোমাকে তোমার নাম ভুলিয়ে দেবে। কাল সকালে আমি চলে যাবো।”

সূচি বলতে লাগলো, “পরদিন এক মাসতুতো দিদির বাড়িতে চলে গেলাম। সঙ্গে নিয়ে গেলাম আমার গয়না যা ছিল আর কিছু শাড়ী। আমার সার্টিফিকেটও নিয়ে চলে গেলাম।
মা বাবার কাছে প্রায় দুবছর ছিলাম। এরই মধ্যে একটি গানের ক্লাসও শুরু করি। বেশ ভালোই চলছিল ক্লাস। এরই মধ্যে বাবার শরীর খারাপ হতে শুরু হলো। তাই সৌরভের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলেন মা বাবা। বিয়ের পর আবার কলকাতা। লোকটি বেশ ভালোই। খুবই যত্নশীল। অনেক জাগরুক। বিয়ের পর গানের আসরে গান না গাইলেও, বাড়িতে বেশ জমতো গানের আড্ডা।
প্রায় বছরখানেক পর, হঠাৎ গানের আড্ডায় নিচে থেকে উঠতে গিয়ে যেন আর উঠলে পারছিলাম না। সৌরভ এসে হাত ধরে বিছানায় নিয়ে গেল। মেরুদণ্ড এর নীচে খুব ব্যথা। পরদিন ডাক্তার দেখানো হলো। ওষুধ চলতে লাগলো। দিনে দিনে যেন পেছনটা ওকেজ লাগছিলো।
এদিকে একদিন সৌরভ বাড়িতে ফিরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে বললো,আজ চলো আইসক্রিম খেতে যাই। এই বলে আমরা বেরিয়ে বেশ আনন্দ করে বাড়ি ফিরলাম। ঠিক এগারোটা নাগাদ সৌরভ বললো,”আমার যেন কেমন বমি পাচ্ছে। এই বলেই বাথরুমে গেল। পেছনে আমিও গেলাম, কিন্তু মিনিটের মধ্যে আমার কাঁধে মাথা রেখে দিলো। চেঁচিয়ে বললাম, ” সৌরভ! সৌরভ ! সব শেষ।
তার পর আমি পঙ্গু হতে লাগলাম। ভাবলাম আমি নিজেই তো ভীষণ অপয়া। আর কারোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবো না । তার পর থেকে– আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না please। এখন আমায় যেতে দে; কল্পনা।”

ডিভোর্সের আগে আমি একটি ছোট বাড়ি কিনেছিলাম সল্টলকে। ”

আমি ওকে আর কোনো অনুরোধ করতে পারলাম না। শুধু বললাম,”নিজের একটু যত্ন নিস সূচি। আর একটা অনুরোধ,তুই গানকে ঠাকুরের আশীর্বাদ হিসাবে চালিয়ে যাবি ;কথা দে।
“দিলাম” বলে বেরিয়ে গেলো। আমি হাত দেখিয়ে bye করলাম। চোখের জলে কিছুক্ষনের মধ্যেই ঝাপসা হয়ে গেল সূচি।

মিষ্টির বাক্স হাতে করে চলতে চলতে ভাবতে লাগলাম ,’রচয়িতা’ তো সর্বশ্রেষ্ঠ। উনি তো অনন্য। মনুষ্যকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে ,সেই মানুষের এক গল্প তৈরি করেন। তারপর সেই মানুষের কর্মের ধাঁচ অনুযায়ী তাকে সুখে অথবা দুঃখে থাকতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেন। গল্পের মধ্যে মেঘ আর আলো দুটোই থাকে । আর কর্মের ফল অনুযায়ী হিসাবনিকাশ হয়। কোনো কর্মই অঙ্কের মতো সমীকরণ হয় না। তারপর গল্পপৃষ্ঠা চলতে থাকে। এই গল্প থেকে কি বাঁচার উপায় আছে?

Posted in Bangla | No Comments »

Leave a Comment

Name:
Mail:   (will not be published)
Website:  

Please note: Comment moderation is enabled and may delay your comment. There is no need to resubmit your comment.

Notify me via email about comments: